তাজা বার্তা | logo

১২ই মাঘ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ | ২৬শে জানুয়ারি, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ

সন্তানদের ছেড়ে করোনা রোগীদের পাশে এই সেবিকা, জানালেন তাঁর গল্প

প্রকাশিতঃ মে ০১, ২০২০, ১৫:০৪

সন্তানদের ছেড়ে করোনা রোগীদের পাশে এই সেবিকা, জানালেন তাঁর গল্প

‘আইসোলেশনে ডিউটি করার সময় খুব কাছ থেকে করোনা রোগীদের শ্বাসকষ্ট ও জ্বর নিয়ে ছটফট করতে দেখেছি। ১০ দিন ডিউটি শেষে হোম কোয়ারেন্টিনে এসেছি। জানি না, আমি নিজেই করোনায় আক্রান্ত কি না। এখন দিন গুনছি, কবে ১৪ দিন শেষে পরিবারের কাছে যেতে পারব।’

কথাগুলো বলছিলেন ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ (ফমেক) হাসপাতালের আইসোলেশন ওয়ার্ডে করোনা রোগীদের সেবায় কর্মরত সাহসী সেবিকা আফসানা আক্তার। সেইসঙ্গে রোগীদের সেবা দিতে গিয়ে তুলে ধরেন কিছু অভিজ্ঞতার কথাও।

কোয়ারেন্টিন শেষে সাত দিন ছুটি নিয়ে পরিবারের কাছে থাকবেন বলে জানিয়েছেন আফসানা। এরপর আবার করোনা রোগীদের সেবায় হাসপাতালে ফিরে আসতে চান তিনি। আফসানা বলেন, ‘আমি এবং আমরা চাই, মানবিকভাবে এই বিপর্যয়ে করোনায় আক্রান্তদের পাশে থাকতে। সেবা করতে গিয়ে সব ভুলে গেছি। নিজেরা রোগীর সেবায় আত্মনিয়োগ করেছি।’

আফসানার স্বামী সৌদি আরব প্রবাসী। তাঁদের ছোট দুই কন্যাসন্তান রয়েছে। সন্তানদের সঙ্গে শহরের একটি বাড়িতে থাকেন আফসানা। করোনায় আক্রান্তদের সেবায় আত্মনিয়োগের পর অজানা আশঙ্কার কথা তুলে ধরে আফসানা বলেন, ‘প্রথম দিন গত ২১ এপ্রিল মঙ্গলবার সকালে যখন হাসপাতালের করোনা ডিউটিতে যাচ্ছিলাম, তখন অজানা আশঙ্কা ও ভয়ে বুক ধুকধুক করছিল। বারবার চোখের সামনে বিদেশে থাকা স্বামী ও দুই ছোট কন্যাসন্তান নুসরাত ও মারিয়ার চেহারা ভেসে আসছিল। আইসোলেশন ওয়ার্ডে মুমূর্ষু রোগীর সেবা করতে গিয়ে আমিও আক্রান্ত হলে, আমার কিছু হয়ে গেলে ওদের কী হবে!’

464363463

করোনাভাইরাস থেকে সুস্থ তিন রোগী ও সেবায় নিয়োজিত স্বাস্থ্যকর্মীদের সঙ্গে সেলফি তুলছেন আফসানা আক্তার।

এই সেবিকা আরো বলেন, ‘তবু কর্তব্য পালনের ব্রত নিয়ে নিজে থেকে করোনা ইউনিটের দায়িত্ব চেয়ে সামনে এগিয়ে যাই। আইসোলশনে ডিউটি করার জন্য বিশেষ ধরনের ব্যক্তিগত সুরক্ষা সামগ্রী (পিপিই) মাস্ক ও চোখে গ্লাস পরার পর প্রথম দিকে কোনোভাবেই শ্বাস-প্রশ্বাস নিতে পারছিলাম না। তারপরও পিপিই ও মাস্ক পরে ডিউটি নিয়ে আইসোলশনে যাই। এভাবে রোগীদের সেবা করতে গিয়ে কিছুটা অভ্যস্ত হয়ে যাই।’

সাহসী এই সেবিকা নিজেই দায়িত্ব নিয়েছেন। আরো পাঁচ সহকর্মীর সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছেন তিনি। তাঁর সঙ্গে দায়িত্বে আছেন আরো পাঁচ সহকর্মী। এর মধ্যে সেবিকা কাকলি খাতুন, ফারজানা, লাভলি, রেহেনা ও মিনারাকে ধন্যবাদ জানান আফসানা। তিনি বলেন, ‘এই সময়ে তাঁদের পেয়ে আমার ক্ষেত্রে কাজ করা সহজ হয়েছে।’

এদিকে, কিছু অভিযোগও তুলে ধরেছেন আফসানা। তাঁদের জন্য বরাদ্দ করা খাবারের মান এবং প্রতিদিন একই ধরনের খাবার দেওয়ার ব্যাপারে ক্ষোভের কথা জানান তিনি। আফসানা বলেন, ‘প্রতিদিন আমাদের খাবারের জন্য ৫০০ টাকা বরাদ্দ থাকলেও দেওয়া হচ্ছে কম দামের নিম্নমানের খাবার। এই ব্যাপারটির উন্নতি হওয়া খুবই দরকার। না হলে আমাদের শরীরে সমস্যা তৈরি হতে পারে।’

আফসানা বলেন, ‘সকালে আমাদের জন্য কোনো নাশতার ব্যবস্থা নেই। কোনোমতে নিজেদের মুড়ি-চিড়া খেয়ে দুপুর পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করছি।’

অন্যসব বিভাগের খাবারের মানের চেয়ে করোনাযোদ্ধা হিসেবে দায়িত্ব পালন করা সবার খাবারের মান উন্নত হওয়ার ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা রয়েছে বলেও জানান এই সেবিকা।

রোগীদের সেবা দেওয়ার ব্যাপারে আফসানা জানান, গত ১০ দিনে আইসোলেশন ওয়ার্ডে পাঁচজন করোনা রোগীকে খুব কাছে থেকে (ক্লোজ কন্টাক্ট) চিকিৎসা দিয়েছেন তিনি। পাঁচজনের মধ্যে তিনজনকে সুস্থ করে বাড়িতে যেতে সাহায্য করেছেন। তবে কয়েক দিন আগে আইসোলেশনে থাকার সময় দুজন রোগী করোনার উপসর্গ নিয়ে ভর্তি হয়ে মৃত্যুবরণ করেন।

ফমেক হাসপাতালের এই সেবিকা বলেন, ‘আমরা প্রথম থেকেই বুঝতে পেরেছিলাম, তাঁরা করোনা রোগী নন। তারপরও তাঁদের এখানে রেখে চিকিৎসা করানো হলো। এ সময় কর্তব্যরত নার্সরা সার্বক্ষণিক তাঁদের পাশে ছিলেন। এ ক্ষেত্রে চিকিৎসকরাও তাঁদের সার্বিক সহযোগিতা করেছেন। তারপরও তাঁদের বাঁচানো যায়নি।’

১০ দিন কাজ করার পর এখন হাসপাতালেই ১৪ দিনের কোয়ারেন্টিনে রয়েছেন আফসানা। কোয়ারেন্টিন শেষ না হলে তিনি পরিবারের কাছে যেতে পারছেন না। এখন হাসপাতালে বসে স্বামী ও সন্তানদের সঙ্গে মোবাইল ফোনে কথা বলেন এই সেবিকা। তিনি বলেন, ‘পাচঁ বছরের ছোট মেয়েটি যখন মা বলে ডেকে ওঠে, তখন বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে ওঠে।’ কিন্তু এ মুহূর্তে কাছে গেলেই সংক্রমিত হতে পারে—এ আশঙ্কায় বুকে পাথর বেঁধে অপেক্ষা করছেন তিনি।

দুই মেয়েকে ফেলে কাজ করার জন্য খুব একটা খারাপ লাগেনি আফসানার; বরং পেশাদার সেবিকা হিসেবে মুমূর্ষু রোগীর সেবা করতে পেরে নিজেকে গর্বিত বলে মনে করেন তিনি।


© তাজা বার্তা ২০২১

Developed by XOFT IT