তাজা বার্তা | logo

৮ই মাঘ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ | ২২শে জানুয়ারি, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ

পদও হারালেন জাহেদুল, দুই ইউএনওর বদলি স্থগিত

প্রকাশিতঃ মে ০২, ২০২০, ১৯:০৪

পদও হারালেন জাহেদুল, দুই ইউএনওর বদলি স্থগিত

ত্রাণের ১৫ টন চাল আত্মসাতের অভিযোগে কক্সবাজারের পেকুয়া উপজেলার টইটং ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের পদ থেকে মো. জাহেদুল ইসলাম চৌধুরীকে সাময়িক বহিষ্কার করা হয়েছে। এর আগে একই অভিযোগে তাঁকে ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যানের পদ থেকে সাময়িক বহিষ্কার করে স্থানীয় সরকার বিভাগ।

এদিকে পেকুয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সাঈকা সাহাদাতের বদলির আদেশ জারির ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তা স্থগিত করা হয়েছে। গতকাল শুক্রবার চট্টগ্রামের অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার শংকর রঞ্জন সাহা স্বাক্ষরিত এক আদেশে এই স্থগিতাদেশ দেওয়া হয়। একই আদেশে কুমিল্লার ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নাজমা সিদ্দিকা বেগমকে পেকুয়ার নতুন ইউএনও হিসেবে দেওয়া বদলির আদেশও স্থগিত করা হয়েছে।

এর আগে গত বৃহস্পতিবার একই ব্যক্তি স্বাক্ষরিত প্রজ্ঞাপনে পেকুয়ার ইউএনও সাঈকা সাহাদাতকে চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ে সংযুক্ত এবং নাজমা সিদ্দিকা বেগমকে পেকুয়ার নতুন ইউএনও হিসেবে নিয়োগ দিয়ে ৩ মে’র মধ্যে নতুন কর্মস্থলে যোগদান করতে বলা হয়েছিল।

এদিকে এর আগে করোনাভাইরাসের প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য সরকারি বরাদ্দের ১৫ টন চাল আত্মসাৎ করার অভিযোগে পেকুয়া উপজেলার টইটং ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান মো. জাহেদুল ইসলাম চৌধুরীর বিরুদ্ধে মামলা করা হয়। তিনি পেকুয়া ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক। পেকুয়া উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মো. আমিনুল ইসলাম বাদী হয়ে গত মঙ্গলবার রাতে মামলাটি দায়ের করেন।

আমিনুল ইসলাম জানান,কক্সবাজার জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ শাখা থেকে ২০১৯ সালের ২৯ জুলাই মানবিক সহায়তা হিসেবে পেকুয়া উপজেলাকে ৪০ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়। এর মধ্যে ২৫ মেট্রিকটন চাল বিলি করা হয়। বাকি ১৫ মেট্রিক টন চাল গত ৩১ মার্চ টইটং ইউপি চেয়ারম্যান জাহেদুল ইসলাম চৌধুরীর অনুকূলে উপ-বরাদ্দ দেওয়া হয়। করোনা ভাইরাসের প্রভাবে হতদরিদ্রদের মধ্যে বিতরণের জন্য বরাদ্দ দেওয়া ওই চাল টইটং ইউপি চেয়ারম্যান খাদ্য গুদাম থেকে ৬ এপ্রিল উত্তোলন করেন। কিন্তু চালগুলো উত্তোলন করা হলেও তিনি চাল বিতরণের কোনো তথ্য দেননি, মাস্টাররোলসহ অন্যান্য কাগজপত্র জমা দেননি। চালগুলো কী করেছেন সে বিষয়ে বারবার জানতে চাওয়া হলেও কিছুই না জানিয়ে টইটং ইউপি চেয়ারম্যান জাহেদুল ইসলাম চৌধুরী পলাতক রয়েছে। যার কারণে তাঁর বিরুদ্ধে চাল আত্মসাতের মামলা করা হয়েছে।

মামলার পর এ ব্যাপারে জানতে চাইলে সাঈকা সাহাদাত জানিয়েছিলেন, ইউপি চেয়ারম্যান জাহেদুল ইসলামকে গ্রেপ্তার করলে সব তথ্য বেরিয়ে আসবে। তাঁকে গ্রেপ্তারে পুলিশ অভিযান চালাচ্ছে।

এদিকে মামলার পর গত বুধবার টইটং ইউপি চেয়ারম্যান জাহেদুল ইসলাম চৌধুরীকে সাময়িক বরখাস্ত করে প্রজ্ঞাপন জারি করে স্থানীয় সরকার বিভাগ। কিন্তু তাঁকে এখনো গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ।

এরই মধ্যে ওই ১৫ টন চালের সঙ্গে ইউএনও সাঈকা সাহাদাতের জড়িত থাকার অভিযোগ তুলে একটি গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হয়। এরপরই বৃহস্পতিবার রাতে চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার কার্যালয় তাঁকে পেকুয়া থেকে প্রত্যাহার করে এবং নতুন ইউএনও নিয়োগ করে। এই প্রত্যাহার নিয়ে সমালোচনার সৃষ্টি হলে পরে আবার সেই আদেশ স্থগিত করা হয়।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ইউএনও সাঈকা সাহাদাত চাল আত্মসাতে জড়িত থাকার অভিযোগ অস্বীকার করে জানান, সরকারি বরাদ্দের চাল কালোবাজারির অভিযোগ থেকে টইটং ইউপি চেয়ারম্যান জাহেদুল ইসলাম চৌধুরীকে বাঁচাতেই স্থানীয় একটি প্রভাবশালী মহল তাকে ফাঁসিয়েছে।

ইউএনও বলেন, ‘নিয়ম অনুযায়ী ডিও লেটারের মাধ্যমে করোনায় অসহায়দের ত্রাণ হিসেবে চালটা ইউপি চেয়ারম্যানের নামে বরাদ্দ দেই। ওই চাল বিতরণের পর উনার মাস্টার রুলস মানে বিতরণের কপি আমাদের কাছে বুঝিয়ে দেওয়ার কথা। কিন্তু তিনি সেটা জমা দেন নাই। আমার কাজটা হলো মাস্টার রুলস কাগজটা চেক করা। বিতরণের কপিই আমার কাছে আসেনি। যার কারণে আমি তা জমা দিতে পারিনি। এটাকে ইস্যু করেই আমার বিরুদ্ধে অপপ্রচার শুরু হয়।’

সাঈকা সাহাদাত বলেন, ‘ত্রাণের চাল বরাদ্দ নিয়ে জেলা পরিষদ কার্যালয় থেকে একটা তদন্ত হয়েছিল। এতে ইউপি চেয়ারম্যানকেই দায়ী করা হয়। তাঁর বিরুদ্ধে এসব অভিযোগের ডকুমেন্টসও আছে। কিন্তু তিনি দায়ী হওয়ার পর নিজেকে রক্ষা করতে একটা ডার্টি পলেটিক্স করেন।’

চাল আত্মসাৎ বা অবৈধ লেনদেনের সঙ্গে জড়িত নন দাবি করে ইউএনও বলেন, ‘আমি এখানে যোগ দেওয়ার পর শত শত টন চাল এসেছে। সেগুলো থেকে কখনো একটাও আত্মসাতের অভিযোগ আমার বিরুদ্ধে ওঠেনি। মাস্টার রুলস হাতে না আসায় ১৫ টন চালের সঙ্গে আমাকে জড়ানো হয়েছে।’

সাঈকা সাহাদাত বলেন, ‘ইতিমধ্যে ওই চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে মামলা করেছি। লিগ্যালি অ্যাকশন নিয়েছি। আমার প্রতিবেদনের ভিত্তিতেই তাঁকে বহিষ্কার করা হয়েছে। আর এ জন্য তিনি আর তাঁর অনুসারী ও একটি প্রভাবশালী মহল আমাকে ফাঁসানোর পায়তারা শুরু করে।’

টইটং ইউপি চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে ১৫ টন চাল আত্মসাতের ওই মামলাকে কেন্দ্র করেই স্থানীয় প্রভাবশালী মহল ক্ষিপ্ত হয় এবাং তাঁকে যেভাবে হোক পেকুয়া থেকে সরানোর পরিকল্পনা করেন বলে দাবি করেন সাঈকা সাহাদাত। তিনি বলেন, ‘আমার বিরুদ্ধে উত্থাপিত কোনো অভিযোগ সত্য নয়। কিসের ভিত্তিতে উনাদের এই অভিযোগ,কোনো ভিত্তি নেই এসবের। এতে আমার মান-সম্মান নষ্ট হচ্ছে। আমার মানহানি করা হচ্ছে। অথচ আমি দুর্নীতি করেছি,এমন কোনো প্রমাণ কেউ দেখাতে পারবে না। আমি চাই সবাই প্রকৃত সত্যটা জানুক।’

পদ হারালেন জাহেদুল

এদিকে, কক্সবাজার জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মো. মুজিবুর রহমান স্বাক্ষরিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়,পেকুয়া উপজেলার টইটং ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের পদ থেকে মো. জাহেদুল ইসলাম চৌধুরীকে সাময়িক বহিষ্কার করা হয়েছে।

স্থানীয় চেয়ারম্যান হিসেবে করোনাভাইরাস মহামারিতে সরকারি ত্রাণের চাল আত্মসাতের অপরাধে অভিযুক্ত হওয়ায় চরমভাবে দলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়েছে। এই বাস্তবতায় গঠনতন্ত্র অনুযায়ী দলীয় শৃঙ্খলাভঙ্গের অপরাধে টইটং ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব থেকে তাঁকে সাময়িক অব্যাহতি দিতে তড়িৎ সিদ্ধান্ত নেয় জেলা আওয়ামী লীগ।

এর আগে শুক্রবার বিকেলে জেলা আওয়ামী লীগের জরুরি সভা হয়। কমিটির সভাপতি অ্যাডভোকেট সিরাজুল মোস্তফার সভাপতিত্বে জাহেদুলের বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।


© তাজা বার্তা ২০২১

Developed by XOFT IT