শুক্রবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০৯:৫০ পূর্বাহ্ন

মাসিক বেতন সাড়ে ৯ লাখ টাকা ইভ্যালির রাসেল দম্পত্তির

  • আপডেটঃ শুক্রবার, ২৫ জুন, ২০২১
  • ৮১০ বার দেখা হয়েছে

সম্প্রতি নজরদারির বাইরে থাকা ই-কমার্স সাইটগুলোয় উচ্চ মাত্রায় আর্থিক লেনদেনের ঝুঁকির বিষয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে একটি রিপোর্ট পাঠায় বাংলাদেশ ব্যাংক। গ্রাহকদের কাছ থেকে নেওয়া অগ্রিম অর্থের তুলনায় এসব প্লাটফর্মের দৃশ্যমান তেমন কোনো সম্পদ না থাকার বিষয়টিই সেখানে তুলে ধরা হয়েছিল।
রিপোর্টে বলা হয়, অনলাইনভিত্তিক বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান (ই-কমার্স) ইভ্যালির চলতি সম্পদের পরিমাণ ৬৫ কোটি ১৭ লাখ টাকা। এর বিপরীতে প্রতিষ্ঠানটির দেনার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪০৩ কোটি ৮০ লাখ টাকা। সম্পদের চেয়ে ৬ গুণের বেশি এই দেনা পরিশোধ করার সক্ষমতা কোম্পানিটির নেই।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই প্রতিবেদনের প্রেক্ষাপটে ইভ্যালিকে নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কথা বলছেন অনেকে। ইভ্যালিকে নিয়ে নেতিবাচক ও ইতিবাচক দুই ধরণের মন্তব্যই করছে দুই শ্রেণির মানুষ। কেউ কেউ আবার ইভ্যালির ভবিষ্যত নিয়েও শঙ্কা প্রকাশ করছেন।

এর মধ্যে জানা গেল বিপুল লোকসানী প্রতিষ্ঠান হওয়া সত্ত্বেও ইভ্যালীর ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও কোম্পানিটির ৪০ শতাংশ শেয়ারের মালিক মোহাম্মদ রাসেল মাসিক সাড়ে ৪ লাখ টাকা এবং তার স্ত্রী ও ইভ্যালির চেয়ারম্যান এবং কোম্পানির ৬০ শতাংশ শেয়ারের মালিক শামীমা নাসরিন মাসে ৫ লাখ টাকা হারে বেতন নিচ্ছেন।
এছাড়া, রাসেল দম্পত্তি কোম্পানি হতে গাড়িসহ অন্যান্য সুবিধাও ভোগ করছেন।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ইভ্যালির সরবরাহ করা তথ্য অনুযায়ী, ৬২৬ জন কর্মকর্তা কর্মচারী প্রতিষ্ঠানটি হতে বেতন গ্রহণ করছেন। এদের মধ্যে বেশকিছু কর্মকর্তা উচ্চ হারে (সর্বোচ্চ ৮,০২,২৩০ টাকা) বেতন পাচ্ছেন।

অনলাইনে পণ্য কেনাবেচার প্রতিষ্ঠান ইভ্যালির দায়-দেনার প্রকৃত পরিমাণ আরও বেশি হতে পারে এবং বিপুল দায়ের কারণে দীর্ঘমেয়াদে কোম্পানিটির অস্তিত্ব রক্ষা অসম্ভব হতে পারে উল্লেখ করে কোম্পানিটির আর্থিক অনিয়মের ব্যাপকতা নিরূপণের জন্য একটি নিরপেক্ষ চার্টার্ড এ্যাকাউন্ট্যান্ট ফার্ম দিয়ে সামগ্রিক নিরীক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে সুপারিশ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

পরিদর্শন দলকে ইভ্যালি ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে যেসব তথ্য সরবরাহ করেছে, তার সঙ্গে ডাটাবেইজে রক্ষিত তথ্যে বড় ধরণের গড়মিল থাকার আশঙ্কা থেকে বিশেষ অডিট পরিচালনার সুপারিশ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। বলেছে, ইভ্যালিসহ কোন ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান যাতে সামর্থ্যের অতিরিক্ত দায় সৃষ্টি করে নিজেদের অস্তিত্বকে হুমকিতে ফেলতে না পারে, সে বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন।

বাংলাদেশ ব্যাংকের ৬ কর্মকর্তার সমন্বয়ে গঠিত পরিদর্শন দলকে দেওয়া ইভ্যালির ম্যানুয়াল তথ্য অনুযায়ী গ্রাহক ও মার্চেন্টদের কাছে ইভ্যালির দেনার পরিমাণ ৪০৩.৮০ কোটি টাকা। আর কোম্পানিটির চলতি সম্পদের মূল্য মাত্র ৬৫.১৭ কোটি টাকা। আরও ৭৩ কোটি টাকার সমমূল্য গ্রাহকদের পাওনা রয়েছে ইভ্যালির ভার্চুয়াল আইডিতে। কিন্তু কোম্পানিটির ১০টি ব্যাংক হিসাবে মোট টাকা রয়েছে মাত্র ২ কোটি।

ইভ্যালির আর্থিক ব্যবস্থাপনায় অনিয়ম নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘ইভ্যালির আইসিটি সিস্টেমে রক্ষিত লেনদেন সংক্রান্ত ডাটা ও পরিদর্শন দলকে ইভ্যালির সরবরাহ করা ম্যানুয়াল ডাটায় বিস্তর পার্থক্য থাকার কারণে এবং মাসভিত্তিক তথ্য সংরক্ষিত না থাকা ও তথ্য নিয়মিত হালনাগাদ না করার অজুহাতে রেপ্লিকা ডাটাবেইজে পরিদর্শন দলকে অনুসন্ধান চালানোর সুযোগ না দেওয়া উদ্দেশ্যমূলক এবং গ্রহণযোগ্য নয়।’

বাংলাদেশ ব্যাংক বলেছে, ‘পরিদর্শনকালে ইভ্যালি তাদের অতীতের হিসাবের খতিয়ানগুলো (বুকস অব একাউন্টস) দেখাতে পারেনি। কোম্পানিটির আর্থিক ব্যবস্থাপনা বোঝার জন্য মাসিক ভিত্তিতে বিভিন্ন সময়ে গ্রাহকের কাছ থেকে নেওয়া অর্থ হতে মার্চেন্টদের পরিশোধিত অর্থ, গ্রাহককে ফেরত দেওয়া অর্থ, কোম্পানির পরিচালন ও অন্যান্য ব্যয় বাদ দেওয়ার পর বাকি অর্থ কোম্পানির ব্যাংক হিসাবে ও নগদে রয়েছে কি-না, তা মিলিয়ে দেখার প্রয়োজন ছিল।’

কিন্তু ইভ্যালি মাসিক ভিত্তিতে এসব তথ্য সরবরাহ করেনি এবং সরবরাহ না করার কারণ হিসেবে কোম্পানির অতীতের আর্থিক লেনদেনের তথ্য সংরক্ষিত না থাকার বিষয়টি উল্লেখ করেছে। কোন কোম্পানির অতীতের আর্থিক লেনদেনের হিসাব সংরক্ষণ না করার বিষয়টি গ্রহণযোগ্য নয় এবং তা কোম্পানির আর্থিক ব্যবস্থাপনার অন্যতম ত্রুটি নির্দেশ করে- যোগ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

বাংলাদেশ ব্যাংক তাদের পর্যবেক্ষণে বলেছে, কোন একটি কোম্পানির প্রতিটি আর্থিক লেনদেনের তথ্য সঠিক পদ্ধতিতে এন্ট্রি করা এবং তা সুনির্দিষ্ট মেয়াদকাল পর্যন্ত সংরক্ষণ করা আবশ্যক। অতীতের আর্থিক লেনদেনের তথ্যের বিশ্লেষণের মাধ্যমেই কোন একটি কোম্পানি তার ভবিষ্যতের আর্থিক পরিকল্পনা তৈরি করে থাকে। অতীতের আর্থিক লেনদেনের তথ্য ছাড়া কোম্পানির আর্থিক ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে সম্যক ধারণা লাভ ও ভবিষ্যতের সঠিক আর্থিক পরিকল্পনা করা অসম্ভব।

ইভ্যালির কাছে যেসব তথ্য চাওয়া হয়েছিল, প্রতিষ্ঠানটি তার খুবই কম তথ্য বাংলাদেশ ব্যাংক কর্মকর্তাদের দিয়েছে। কোম্পানির ডাটাবেইজে ঢুকতে না দেওয়ায় ওইসব তথ্যের সঠিকতাও যাচাই করা সম্ভব হয়নি। ইভ্যালি সরাসরি বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণাধীন না হওয়ায় প্রতিষ্ঠানটিকে সরাসরি কোন নির্দেশনাও দিতে পারেননি পরিদর্শক দলের কর্মকর্তারা।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ৩০ জুন, ২০২০ তারিখে ইভ্যালির আর্থিক বছর সমাপ্ত হলেও পরিদর্শনকাল (১৪ মার্চ, ২০২১) পর্যন্ত আর্থিক বিবরণীর নিরীক্ষা সম্পন্ন ও অনুমোদন হয়নি। আগে যে প্রতিষ্ঠান দিয়ে নিরীক্ষা করতো, সে প্রতিষ্ঠান পরিবর্তন করেছে এবং আর্থিক বিবরণী দাখিলের সময় বাড়াতে রেজিস্ট্রার অব জয়েন্ট স্টক কোম্পানি এন্ড ফার্মসে আবেদন করা হয়েছে বলে মৌখিকভাবে জানালেও এর স্বপক্ষে কোন কাগজপত্র দেখাতে পারেনি।

‘চলতি অর্থবছরের ১৪ মার্চ পর্যন্ত ইভ্যালির লোকসান তাদের মোট সম্পদের ২.৩৩ গুণ এবং শেয়ার মূলধনের ২১৩.৪৮ গুণ। কোন কোম্পানির লোকসান ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পাওয়া এবং মোট সম্পদের দ্বিগুণেরও বেশি ও শেয়ার মূলধনের দুইশত গুণেরও অধিক হারে লোকসান করা কোম্পানিটির জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এবং আর্থিক ব্যবস্থাপনার অন্যতম ঘাটতি নির্দেশ করে।

অদূর ভবিষ্যতে এই বিপুল পরিমাণ লোকসান কাটিয়ে উঠার কোন গ্রহণযোগ্য পরিকল্পনা না থাকায় দীর্ঘমেয়াদে কোম্পানির অস্তিত্ব রক্ষাকেই অসম্ভব করে তুলতে পারে’- যোগ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

এই বিভাগ থেকে আরও পড়ুন

এক ক্লিকে বিভাগের খবর

স্বত্ব © তাজা বার্তা ২০২০-২০২১
Developed by XOFT IT